

অগ্নিঝরা মার্চ ৭, ১৯৭১❤এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম
,বঙ্গবন্ধুর উদ্দীপ্ত ভাষণে বাঙালি পায় নির্দেশনা,
সুদীর্ঘকালের আপোষহীন আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৯৭১ সালের এই দিনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দান) বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন।
সেদিন লাখ লাখ মুক্তিকামী মানুষের উপস্থিতিতে এই মহান নেতা বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করেন, “রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের এই উদ্দীপ্ত ঘোষণায় বাঙালি জাতি পেয়ে যায় স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা। এই ঘোষণা বিদ্যুৎ গতিতে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
সেদিন লাখো মানুষের উপস্থিতিতে রেসকোর্স ময়দান ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। মুহুর্মুহু স্লোগান ছিল—‘তোমার আমার ঠিকানা/পদ্মা মেঘনা যমুনা’। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল মাত্র ১৯ মিনিটের। এটুকু সময়ের ভাষণেই তিনি বাঙালির বঞ্চনার ইতিহাসের পুরো ক্যানভাস তুলে ধরেন। তারপর বলেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তা–ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।’
বঙ্গবন্ধু ১ মার্চেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন, ৭ মার্চ তিনি রেসকোর্স ময়দানে বক্তব্য দেবেন। তাঁর বক্তব্য শোনার জন্য সকাল থেকেই দেশের দূরদূরান্তের মানুষ দলে দলে পায়ে হেঁটে, বাসে-লঞ্চে-ট্রেনে চেপে রেসকোর্স ময়দানে সমবেত হতে থাকেন। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ধর্ম-বর্ণ-গোত্রনির্বিশেষে নারী-পুরুষে সয়লাব হয়ে যায় বিশাল ময়দান।
বয়স, পেশা, সামাজিক মর্যাদা ভুলে গিয়ে সর্বস্তরের মানুষ হাতে বাঁশের লাঠি, কণ্ঠে ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনি আর চোখে মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে এক ও অভিন্ন লক্ষ্যে নেতার নির্দেশ শোনার জন্য উপস্থিত হন। বেলা সোয়া তিনটায় বঙ্গবন্ধু সভামঞ্চে এসে উপস্থিত হন। সফেদ পায়জামা-পাঞ্জাবি আর কালো কোট পরে শেখ মুজিব মঞ্চে এসে দাঁড়ালে বীর জনতা করতালি ও ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে প্রাণপ্রিয় নেতাকে অভিনন্দন জানান।
ঐতিহাসিক ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে গর্জে উঠে উত্তাল জনসমুদ্র। লাখ লাখ মানুষের গগনবিদারী স্লোগানের উদ্দামতায় বসন্তের মাতাল হাওয়ায় সেদিন পত্ পত্ করে ওড়ে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লাল-সবুজের পতাকা। লাখো শপথের বজ্রমুষ্টি উত্থিত হয় আকাশে। সেদিন বঙ্গবন্ধু মঞ্চে আরোহণ করেন বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে। ফাগুনের সূর্য তখনো মাথার ওপর। মঞ্চে আসার পর তিনি জনতার উদ্দেশ্যে হাত নাড়েন।
তিনি দরাজ গলায় ভাষণ শুরু করেন, ‘ভাইয়েরা আমার, আজ দুঃখ-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি…।’ এরপর জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বাংলা ও বাঙালির স্বাধীনতার মহাকাব্যের কবি ঘোষণা করেন—’এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম…, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
বঙ্গবন্ধু তাঁর ১৯ মিনিটের ঐতিহাসিক ভাষণে বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের দুর্গম-দুস্তর পথের প্রান্তে বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্ন বাস্তবায়নের স্মৃতিফলক বসিয়ে দেন। সংগ্রামে উন্মুখ জাতির কাছে পৌঁছে দেন স্বাধীনতার মন্ত্রণা।
এই স্বল্প সময়ে তিনি ইতিহাসের পুরো ক্যানভাসই তুলে ধরেন। তিনি ভাষণে সামরিক আইন প্রত্যাহার, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর, গোলাগুলি ও হত্যা বন্ধ করে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন স্থানের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের দাবি জানান।
লাখ লাখ মুক্তিসংগ্রামীর উদ্দেশে তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।…আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়,…আমি যদি হুকুম দিবার না–ও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।…এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তা–ই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দিব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশা আল্লাহ।’
৭ই মার্চ ১৯৭১
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ ।
ভায়েরা আমার,
আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। কী অন্যায় করেছিলাম? নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে, আওয়ামী লীগকে ভোট দেন।
আমাদের ন্যাশনাল এসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরি করবো এবং এদেশকে আমরা গড়ে তুলবো। এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় ২৩ বৎসরের করুণ ইতিহাস, বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। ২৩ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস-এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সালে আয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে ১০ বছর পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালে ৬দফা আন্দোলনে ৭ই জুনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯ এর আন্দোলনে আয়ুব খানের পতন হওয়ার পরে যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, তিনি বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন, গনতন্ত্র দেবেন – আমরা মেনে নিলাম।
তারপরে অনেক ইতিহাস হয়ে গেলো, নির্বাচন হলো। আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি, শুধু বাংলা নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাকে অনুরোধ করলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, প্রথম সপ্তাহে মার্চ মাসে হবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে, আমরা এসেম্বলিতে বসবো। আমি বললাম, এসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করবো- এমনকি আমি এ পর্যন্তও বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজনও যদি সে হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব। জনাব ভুট্টো সাহেব এখানে এসেছিলেন, আলোচনা করলেন। বলে গেলেন, আলোচনার দরজা বন্ধ না, আরো আলোচনা হবে। তারপরে অন্যান্য নেতৃবৃন্দ, তাদের সঙ্গে আলাপ করলাম- আপনারা আসুন, বসুন, আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈরি করবো।
তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা যদি এখানে আসে তাহলে কসাইখানা হবে এসেম্বলি। তিনি বললেন, যে যাবে তাকে মেরে ফেলা দেয়া হবে। যদি কেউ এসেম্বলিতে আসে তাহলে পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত জোর করে বন্ধ করা হবে। আমি বললাম, এসেম্বলি চলবে। তারপরে হঠাৎ ১ তারিখে এসেম্বলি বন্ধ করে দেওয়া হলো। ইয়াহিয়া খান সাহেব প্রেসিডেন্ট হিসেবে এসেম্বলি ডেকেছিলেন। আমি বললাম যে, আমি যাবো। ভুট্টো সাহেব বললেন, তিনি যাবেন না। ৩৫ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে আসলেন। তারপর হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হলো, দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। বন্ধ করে দেয়ার পরে এদেশের মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল।
আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে আপনারা হরতাল পালন করেন। আমি বললাম, আপনারা কলকারখানা সব কিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ সাড়া দিলো। আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো, তারা শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য স্থির প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো।
কী পেলাম আমরা? আমার পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরীব-দুঃখী নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে- তার বুকের ওপরে হচ্ছে গুলি। আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু- আমরা বাঙালীরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
টেলিফোনে আমার সঙ্গে তার কথা হয়। তাঁকে আমি বলেছিলাম, জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কিভাবে আমার গরীবের ওপরে, আমার বাংলার মানুষের বুকের ওপর গুলি করা হয়েছে। কী করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে, কী করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন। তিনি বললেন, আমি নাকি স্বীকার করেছি যে, ১০ই তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স হবে। আমি তো অনেক আগেই বলে দিয়েছি, কিসের রাউন্ড টেবিল, কার সঙ্গে বসবো? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে, তাদের সঙ্গে বসবো? হঠাৎ আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে পাঁচ ঘণ্টা গোপনে বৈঠক করে যে বক্তৃতা তিনি করেছেন, সমস্ত দোষ তিনি আমার ওপরে দিয়েছেন, বাংলার মানুষের ওপরে দিয়েছেন।
ভায়েরা আমার, ২৫ তারিখে এসেম্বলি কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি ১০ তারিখে বলে দিয়েছি, ওই শহীদের রক্তের ওপর পাড়া দিয়ে আরটিসিতে মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারেনা। এসেম্বলি কল করেছেন, আমার দাবী মানতে হবে। প্রথম, সামরিক আইন- মার্শাল ল’ উইথড্র করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে। যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে। আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখবো, আমরা এসেম্বলিতে বসতে পারবো কি পারবো না। এর পূর্বে এসেম্বলিতে বসতে আমরা পারি না। আমি, আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারী, আদালত-ফৌজদারী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।
গরীবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে সেইজন্য যে সমস্ত অন্যান্য জিনিসগুলো আছে সেগুলোর হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা, ঘোড়ারগাড়ি, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে- শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি গভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদা কোন কিছু চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারীরা যেয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এরপরে যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয় – তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।
তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু – আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের ওপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়া রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবেনা। আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগের থেকে যদ্দুর পারি তাদের সাহায্য করতে চেষ্টা করবো। যারা পারেন আমাদের রিলিফ কমিটিতে সামান্য টাকা-পয়সা পৌঁছে দেবেন। আর এই সাত দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছে, প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছে দেবেন।
সরকারি কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে, খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো- কেউ দেবে না। মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দুমুসলমান, বাঙালী-ননবাঙালী যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আপনাদের ওপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়। মনে রাখবেন, রেডিও-টেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনে তাহলে কোন বাঙালী রেডিও স্টেশনে যাবে না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, কোন বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না।
২ ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাদের মায়না-পত্র নেবার পারে। পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন, টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ব বাংলায় চলবে এবং বিদেশের সংগে নিউজ পাঠাতে হলে আপনারা চালাবেন। কিন্তু যদি এ দেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালীরা বুঝেসুঝে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল। এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। রক্ত যখন দিয়েছি, আরো রক্ত দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।
জয় বাংলা
ঢাকা বেতার স্তব্ধ
ঢাকা বেতারে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচার না করার প্রতিবাদে বেতারে কর্মরত বাঙালি কর্মচারীরা কাজ বর্জন করেন। বিকেল থেকে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমে জানানো হয়, বঙ্গবন্ধুর গুরুত্বপূর্ণ এ ভাষণ বেতারে প্রচার করা হবে। এ ঘোষণার পর সারা বাংলার শ্রোতারা অধীর আগ্রহে রেডিও নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। বেলা ২টা ১০ মিনিট থেকে ৩টা ২০ মিনিট পর্যন্ত ঢাকা বেতারে দেশাত্মবোধক রবীন্দ্রসংগীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ পরিবেশন করা হয়। গানটির পরিবেশনা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করার মুহূর্তেই হঠাৎ ঢাকা বেতারের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার বন্ধের প্রতিবাদে কাজ বন্ধ করে দেন বেতার কর্মীরা। অচল হয়ে পড়ে কেন্দ্র। পরে বেতার কর্মীদের দাবির মুখে গভীর রাতে সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকা বেতারে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পূর্ণ বিবরণ প্রচারের অনুমতি দেয়।
বঙ্গবন্ধুর বিবৃতি
৭ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে একটি বিবৃতি দেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, ১ মার্চ আকস্মিকভাবে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদরত নিরস্ত্র বেসামরিক জনতার ওপর ব্যাপকভাবে গুলি চালানো হয়েছে। গত সপ্তাহে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁরা শহীদ হয়েছেন।
বঙ্গবন্ধু বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া যাকে ‘সর্বনিম্ন শক্তি প্রয়োগ’ বলেছেন, তাতেই যদি হাজার হাজার লোক হতাহত হতে পারে, তাহলে তাঁর অভিহিত ‘পর্যাপ্ত শক্তি প্রয়োগ’–এর অর্থ কি ‘আমরা সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে যাব’?
বঙ্গবন্ধু বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যদি আন্তরিকভাবে মনে করেন, জনসাধারণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সার্বভৌম সংস্থা হিসেবে জাতীয় পরিষদকে কার্যকর করা উচিত, তাহলে নিম্নলিখিত ব্যবস্থাসমূহ অবিলম্বে প্রতিপালিত হতে হবে: ১. সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অবিলম্বে সেনাছাউনিতে ফিরিয়ে নেওয়া। ২. বেসামরিক জনতার ওপর অবিলম্বে গুলিবর্ষণ বন্ধ করা। ৩. পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে বিপুল সংখ্যায় সামরিক বাহিনীর লোক আনা বন্ধ করা। ৪. বাংলাদেশে সরকারি প্রশাসনের ওপর সামরিক কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং সরকারি কর্মচারীদের ব্যাপারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া। ৫. আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ভার সম্পূর্ণভাবে পুলিশ বা বাঙালি ইপিআরের ওপর ন্যস্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবকদের সাহায্য নেওয়া।
ঢাকায় আসগর খানের সংবাদ সম্মেলন
বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পরপরই ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করেন এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান। তিনি সামরিক শাসন প্রত্যাহার এবং অনতিবিলম্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের উদাত্ত আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ শাসন করার অধিকার আছে। ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগদান নিয়ে আওয়ামী লীগপ্রধান আজ যে শর্তগুলো দিয়েছেন, তা ন্যায়সংগত ও বৈধ।
বিদেশিদের অপসারণ
ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের অপসারণের জন্য এই দিন দুটি বিদেশি বিমান ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। কূটনৈতিক মিশনগুলো তাদের নাগরিকদের এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিজ নিজ দেশের কাছে এর আগে খবর পাঠিয়েছিল।
৭ মার্চ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে কোনো নির্ধারিত ফ্লাইট ছিল না। পাকিস্তান বিমানবাহিনী শুধু কয়েকটি বিশেষ ফ্লাইট চালু রেখেছিল।
লন্ডনে বিক্ষোভ
যুক্তরাজ্যপ্রবাসী প্রায় ১০ হাজার বাঙালি লন্ডনে পাকিস্তান হাইকমিশনের সামনে স্বাধীন বাংলার দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাঁরা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে ‘ভুট্টোর বিচার চাই’ স্লোগান দেন।
একাত্তরের দিনগুলি
আজ বিকেলে রমনা রেসের মাঠে গণজমায়েত। গত ক’দিন থেকে শহরের সবখানে সবার মধ্যে এই জনসভা নিয়ে তুমুল জল্পনা-কল্পনা, বাকবিতন্ডা, তর্ক-বিতর্ক। সবাই উত্তেজনায়, আগ্রহে, উৎকণ্ঠায়, আশঙ্কায় টগবগ করছে। আমি যদিও মিটিংয়ে যাব না, বাসায় বসে রেডিওতে বক্তৃতার রিলে শুনব, তবু আমাকেও এই উত্তেজনার জ্বরে ধরেছে।
এর মধ্যে সুবহান আমাকে জ্বালিয়ে মারল। আজ তাড়াতাড়ি রান্না সারতে বলেছিলাম। শরীফ বলেছে বারোটার মধ্যে খাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নেবে। ঠিক দেড়টাতে রওনা দেবে, নইলে কাছাকাছি দাঁড়াবারও জায়গা পাবে না। আর সুবহান হতচ্ছাড়াটা এগারোটার সময় গোশত পুড়িয়ে ফেলল। বারেককে দিয়েছিলাম রুমী জামীদের সার্ট ইস্ত্রি করতে। সুবহান চুলোয় গোশত রেখে বারেকের সঙ্গে ইস্ত্রি করাতে মেতেছে। তিনিও আজ শেখের বক্তৃতা শুনতে যাবেন, তাই তার নিজের প্যান্ট সার্ট ইস্ত্রি তদারকিতে যখন মগ্ন, তখন গোশত গেছে পুড়ে। কি যে করি ওকে নিয়ে। তাড়াতাড়ি ডিমের অমলেট করে ডাল-ভাজিসহ ভাত দিলাম শরীফদের।
এতবড় কান্ড করে, এত বকা খেয়েও সুবহানের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। রান্নাঘরে সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে প্যান্ট-সার্ট পরে তিনি শরীফদের সঙ্গে চললেন শেখের বক্তৃতা শুনতে।
আজ বারেকও গেছে ওদের সঙ্গে। এর আগে কোনো মিটিংয়ে যেতে দিইনি ওকে। আজকে না দিলে বড় অন্যায় হবে।
কিটির ঘরে গিয়ে ওর বারো ব্যান্ডের দামী রেডিওটা চেয়ে নিয়ে উপরে গেলাম। ওকেও আসতে বললাম আমার ঘরে। বাবা দুপুরের খাওয়ার পরে শুয়ে ঘুমোচ্ছেন। আমি রেডিওটা নিয়ে আয়েশ করে বিছানায় শুলাম। একটু পরে কিটিও এল। রেডিও অন করে রেখেই দু’জনে শুয়ে শুয়ে গল্প করতে লাগলাম।
রেডিওতে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটা শোনা গেল। আমরা কথা বন্ধ করে উৎকর্ণ হয়ে রইলাম। ওমা! তারপর আর শব্দ নেই। কি ব্যাপার?
শব্দ নেই তো নেই-ই। কারেন্ট গেল? বাতির সুইচ টিপে দেখলাম কারেন্ট আছে। রেডিওটা খারাপ হল? নব ঘুরিয়ে দেখলাম অন্য স্টেশন ধরছে। তাহলে?
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, “চল ছাদে যাই তো।”
দু’জনে ছাদে গেলাম। পুবদিকে সোজাসুজি মাপলে মাত্র আধ মাইল দূরে রেসের ময়দান। নানা রকম শ্লোগানের অস্পষ্ট আওয়াজ আসছে। আকাশে চক্কর দিচ্ছে হেলিকপ্টার। হেলিকপ্টার কেন? কি ব্যাপার?
ব্যাপার সব জানা গেল শরীফরা মিটিং থেকে ফেরার পর। কলিং বেলের শব্দ শুনে ছুটে গিয়ে দরজা খুলতেই রুমী দুই হাত তুলে নাটকীয় ভঙ্গিতে “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” বলতে বলতে ঘরে ঢুকল। দেখি, ফখরুদ্দিনও এসেছেন। ফখরুদ্দিন-সংক্ষেপে ফকির, শরীফের স্কুল জীবনের বন্ধু। তার পেশা ব্যবসা আর নেশা রাজনীতি, যদিও কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য তিনি নন। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনের খবরাখবরে তার চেয়ে ওয়াকিবহাল আমাদের জানার মধ্যে আর নেই।
সোফায় ধপ করে বসে পড়ে ফকির বললেন, “ভাবী, চা খাওয়ান। এক সঙ্গে তিন কাপ-গলা শুকিয়ে কাঠ।”
“চেহারাও তো শুকিয়ে কাঠি। কি করে বেড়ান আজকাল? খান না নাকি?”
শরীফ মুচকি হেসে বলল, “নেতাদের লেজ ধরে দৌড়াদৌড়ির চোটে ওর নাওয়া-খাওয়ার ফুরসত নেই।” সুযোগ পেলেই শরীফ ফকিরের পেছনে লাগে। আমি সুবহানকে চায়ের হুকুম দিয়ে সোফায় বসলাম, “ওসব লেগ-পুলিং এখন রাখ। মিটিংয়ের কথা বল। রেডিও বন্ধ হয়ে রয়েছে কেন? আকাশে হেলিকপ্টার দেখলাম যেন।”
রুমী বলল, “হেলিকপ্টার তো পয়লা তারিখের পল্টন জনসভাতেও ছিল। ওরা বোধহয় গার্ড অব অনার দেওয়ার রেওয়াজ করেছে।”
সবাই হেসে উঠল। কিটি রেডিও হাতে গুটিগুটি এসে দাঁড়াল, মৃদুকণ্ঠে বলল, “রেডিও এখনো চুপ।”
আমি বললাম, “কিটি এখানে এসে বস। আজ তোমার বাংলা বোঝার পরীক্ষা নেব। এখানে বসে আমাদের বাংলায় কথাবার্তা শোন, তারপর পুরোটা বলতে হবে। রেডিওটা খোলাই থাক।”
কিটি হেসে সহজ হল, সোফায় এসে বসল। আমরা বাঁচালাম- এখন কলকল করে মাতৃভাষায় আলাপ না করলে প্রাণে শান্তি হবে না।
রেসকোর্স মাঠের জনসভায় লোক হয়েছিল প্রায় তিরিশ লাখের মতো। কত দূর-দূরান্তর থেকে যে লোক এসেছিল মিছিল করে, লাঠি আর রড ঘাড়ে করে-তার আর লেখাজোখা নেই। টঙ্গী, জয়দেবপুর, ডেমরা- এসব জায়গা থেকে তো বটেই, চব্বিশ ঘন্টার পায়ে হাঁটা পথ পেরিয়ে ঘোড়াশাল থেকেও বিরাট মিছিল এসেছিল গামছায় চিড়ে-গুড় বেঁধে। অন্ধ ছেলেদের মিছিল করে মিটিংয়ে যাওয়ার কথা শুনে হতবাক হয়ে গেলাম। বহু মহিলা, ছাত্রী মিছিল করে মাঠে গিয়েছিল শেখের বক্তৃতা শুনতে।
“কিন্তু শেখ নিরাশ করেছে সবাইকে।” রুমীর একথায় সবচেয়ে প্রতিবাদ করে উঠলেন ফকির, “তোমার মাথা গরম, চ্যাংড়া ছেলেরা কি যে বল না-ভেবেচিন্তে শেখ যা করেছে, একদম ঠিক করেছেন।”
সেই পুরনো বাকবিতন্ডা-যা গত কয়েকদিন ধরে সর্বত্রই শুনছি। একদল চায় শেখ স্বাধীনতার ঘোষণা দিন- আরেক দল বলছে তাহলে সেটা রাষ্ট্রদ্রোহিতা হবে। বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হবে।
রুমী তার স্বভাবসিদ্ধ মৃদু গলাতেই দৃঢ়তা এনে প্রতিবাদ করল, “আপনারা দেয়ালের লিখন পড়তে অপারগ। দেখেন নি আজ মিটিংয়ে কত লাখ লোক স্বাধীন বাংলার পতাকা হাতে এসেছিল? জনগণ এখন স্বাধীনতাই চায়, এটা তাদের প্রাণের কথা। নইলে মাত্র এই ছ’দিনের কর্মকান্ডের মধ্যে সবাই সবখানে স্বাধীন বাংলার ঐ রকম ম্যাপ লাগানো পতাকা সেলাই করার মত একটা জটিল কাজ, অন্যসব কাজ ফেলে, করে, সেটা আবার বাতাসে নাড়াতে নাড়াতে প্রকাশ্য দিবালোকে মিছিল করে যায়?”
তর্কের গন্ধ পেলে তর্কবাগীশ ফকির সর্বদাই চাঙ্গা, তিনি বললেন, “তুমিও দেখছি চার খলিফার দলের।”
রুমি বলল, “আমি কোনো দলভুক্ত নই, কোনো রাজনৈতিক দলের শ্লোগান বয়ে বেড়াই না। কিন্তু আমি সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন, মান-অপমান বোধসম্পন্ন একজন সচেতন মানুষ। আমার মনে হচ্ছে শেখ আজ অনায়াসে ঢাকা দখল করার মস্ত সুযোগ হারালেন।”
আমি বাধা দিয়ে বলে উঠলাম, এই সুদূরপ্রসারী তর্ক শুরু করার আগে আমি তোমাদের কাছ থেকে শুনতে চাই ছোট্ট একটা খবর। শেখের বক্তৃতা রিলে করা হবে বলে সারা দিন রেডিওতে অ্যানাউন্স করেও শেষ পর্যন্ত রিলে করা হল না কেন? কেনই বা রেডিও একদম ডেডস্টপ? এইটে শোনার পর আমি রান্নাঘরে চলে যাব। তখন তোমরা মনের সুখে সারারাত কচকচ কোরো।”
“শেখের বক্তৃতা রিলে করার জন্য বেতার-কর্মীরা তো তৈরিই ছিল। শেষ মুহুর্তে মার্শাল ল অথরিটি বক্তৃতা রিলে করতে দিল না। ব্যস, অমনি রেডিও স্টেশনের সমন্ত কর্মীরা হাত গুটিয়ে বসল। শেখের বক্তৃতা রিলে করতে না দিলে অন্য কোনো প্রোগ্রামই যাবে না। তাই রেডিও এরকম চুপ।”
জামী এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি, এখন হঠাৎ বলে উঠল, “জান মা, আজ বিকেলের প্লেনে টিক্কা খান ঢাকায় এসেছে গভর্নর হিসাবে।”
এক সপ্তাহ দুইবার গভর্নর বদল। এক তারিখে ভাইস এডমিরাল এস. এম. আহসানকে বদলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে দেওয়া হয়েছিল, এখন আবার ছ’দিনের মাথায় তাকে সরিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে আনা হল। কি এর আলামত?
আজ রাতে রেডিও আর গলাই খুলল না।
– শহীদ জননী জাহানারা ইমামের বই থেকে
তথ্যসূত্র:
দৈনিক ইত্তেফাক, ৮ মার্চ ১৯৭১
দৈনিক আজাদ, ৮ মার্চ ১৯৭১
দৈনিক পাকিস্তান, ৮ মার্চ ১৯৭১
ডন, ৮ মার্চ ১৯৭১
দৈনিক পুর্বদেশ, ৮ মার্চ ১৯৭১
প্রথম আলো ডেস্ক, প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২১, ০৮: ০২
দি ডেইলী স্টার বাংলা, ৭ মার্চ ২০২৪, ০৩:০৭ পূর্বাহ্ন
দি ডেইলী স্টার বাংলা, আজ, ৭ মার্চ ২০১৯, ০৪:৩৩ পূর্বাহ্ন, সর্বশেষ আপডেট: ৭ মার্চ ২০১৯, ১২:৫৫ অপরাহ্ন
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, Published : 06 Mar 2019, 11:52 PM, Updated : 07 Mar 2019, 08:24 AM
বিবিসি বাংলা, ঢাকা, ৭ মার্চ ২০১৬
ঢাকা ট্রিবিউন, প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৪, সকাল ১০:৪৬আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৪, সকাল ১০:৪৬
মন্তব্য করুন